ব্যাংকের চাকরি কি হালাল?একদিন এক জুনিয়র কলিগ...See more


ব্যাংকের চাকরি কি হালাল? একদিন এক জুনিয়র কলিগ এর

 ব্যাংকের চাকরি কি হালাল?




..





একদিন এক জুনিয়র কলিগ এর সাথে কথা বলছিলাম। এটা-সেটা বলার এক পর্যায়ে সে বললো, 'স্যার, চাকরিতে মন বসে না।'




- কেনো?




- সুদের চাকরি করি, স্যার। রিজিক হালাল নয়। জাহান্নামের আগুনে পুড়তে হবে।




- এ নিয়ে আপনি খুব চিন্তিত?




- সারাক্ষণ মন খুঁতখুঁত করে, স্যার...।




- আচ্ছা, আমার একটা কথার উত্তর দেন। সামনে তো রমজান। রমজানে সারা দেশের মানুষ ইফতার করবে। করবে না?




- তা তো করবেই।




- ইফতারে শরবত খান?




- তা তো খাই।




- মোটামুটি সব রোজাদারই তো শরবত খায়, তাই না?




- তা খায়, স্যার।




- শুধু রোজার মাসে বাংলাদেশে কতো চিনি লাগে, ধারণা আছে, আপনার?




- কতো লাগে, স্যার?




- আমরা একটা সহজ হিসাব ধরি, ২০ কোটি মানুষের গড়ে ১ কেজি করে চিনি লাগে। তাহলে, ২০ কোটি কেজি চিনি লাগে।




- তা লাগে।




- এই ২০ কোটি কেজি চিনি কিন্তু আমাদের দেশে উৎপাদন হয় না। বিদেশ থেকে আমদানি করে আনতে হয়।




- সেটা জানি, স্যার।




- আপনি কী জানেন, আমরা মূলত কোন দেশের চিনি খাই?




- না, তো, স্যার!




- আমরা মূলত ব্রাজিল থেকে চিনি আমদানি করি। আচ্ছা, চিনি কীসে করে পরিবহন করা হয়, জানেন?




- জাহাজে করে?




- হ্যাঁ, জাহাজে করে। একটা জাহাজে কতোটুকু চিনি পরিবহন করা যায়, আইডিয়া আছে, আপনার?




- না তো, স্যার।




- একটা বড় জাহাজে ৫০,০০০ টন চিনি পরিবহন করা যায়। ৫০,০০০ টন মানে ৫ কোটি কেজি।




- এতোওওওওও?




- হ্যাঁ, ৫ কোটি কেজি। ৫ কোটি কেজি চিনি আমদানি করতে কতো টাকা লাগে, জানেন?




- কতো, স্যার?




- একটা রাউন্ড ফিগার ধরি। কেজিতে ৬০ টাকা। তাহলে, ৫ কোটি কেজি চিনি আমদানি করতে ৩০০ কোটি টাকা লাগবে।




- কম করে আমদানি করা যায় না?




- যায়, তাতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে যায়। বেশি পরিবহন খরচ আল্টিমেটলি ক্রেতার উপরেই পড়বে। তাই, একবারে বড় জাহাজে করেই সাধারণত পণ্য পরিবহন করা হয়।




- তাহলে এক জাহাজ চিনি আনতে ৩০০ কোটি টাকা লাগে?




- হ্যাঁ, ৩০০ কোটি মাত্র! আচ্ছা, একজন ব্যবসায়ীর হাতে কি ৩০০ কোটি টাকা থাকে?




- থাকতে পারে।




- থাকা টাফ। এতো টাকা একবারে ইনভেস্ট করতে চায় না কেউ। আচ্ছা, ধরেন, কারও হাতে ৩০০ কোটি টাকা থাকলো৷ সে এই টাকা ব্রাজিলের বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দেবে কেমন করে?




- ব্যাংকের মাধ্যমে।




- যেটা হয়, ব্যাংক একটা এলসি দেয় ব্রাজিলের ব্যাংককে। ব্রাজিলের ব্যাংক বিক্রেতাকে আশ্বস্ত করে যে, বাংলাদেশের বিক্রেতার ঠিকানায় চিনি জাহাজীকরণ করলে এবং জাহাজীকরণ এর দলিল বাংলাদেশের ব্যাংকে পাঠালে বাংলাদেশের ব্যাংক বিক্রেতাকে পেমেন্ট দেবে।




- তাই?




- আপনি মাত্র ব্যাংকে জয়েন করেছেন, কিছুদিন গেলে বুঝবেন এর বিভিন্ন কার্যক্রম। আপাতত জেনে রাখুন, দেশের সব বৈদেশিক বাণিজ্যে মধ্যস্থতা করে ব্যাংক।




- এলসি পেলেই ৫ কোটি কেজি চিনি পাঠাবে ব্রাজিলের বিক্রেতা?




- পাঠাবে৷ শুধু পাঠাবেই না, ঠিকঠাক ডকুমেন্টস পেলে সময়মতো পেমেন্টও দেবে বাংলাদেশের ব্যাংক। ইন ফ্যাক্ট, এলসি দেবার সময়ই বাংলাদেশের ব্যাংক অপ্রত্যাহারযোগ্য আন্ডারটেকিং দেয় যে, ঠিকঠাক ডকুমেন্টস পেলে সে পেমেন্ট দেবে।




- এরপরে, বাংলাদেশের আমদানিকারক যদি ব্যাংককে টাকা না দেয়?




- আমদানিকারক টাকা না দিলেও ব্যাংক ব্রাজিলের রপ্তানিকারককে টাকা দিয়ে দেবে, ডকুমেন্টস ঠিকঠাক বুঝে পেলে।




- তারপর, ব্যাংক টাকা আদায় করবে কীভাবে?




- ইন ফ্যাক্ট, এ ব্যাপারে ব্যাংক আর আমদানিকারকের মধ্যে এ ব্যাপারে এরেঞ্জমেন্ট থাকে। আমদানিকারক এলসি খোলার সময় কিছু টাকা দেয়। এরপরে ব্যাংকের কাছ থেকে ডকুমেন্টস নিয়ে মাল ছাড়ায়। তারপর মাল বেচে ব্যাংকে টাকা ফেরত দেয়।




- আমদানিকারক যদি শেষমেশ টাকা দিতে না পারে?




- সেটা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকের নিজস্ব মেকানিজম আছে। এখন, আপনি বলেন, ব্যাংক না থাকলে কি চিনি আমদানির ব্যাপারটা স্মুথলি হতো?




- না মনে হয়, স্যার।




- মনে হচ্ছে?




- না, স্যার। ব্যাংক এখানে ইম্পর্ট্যান্ট রোল প্লে করেছে।




- ঠিক এইভাবে বাংলাদেশের সব বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংক ইন্টারমিডিয়ারির রোল প্লে করে। আমদানিতে যেমন করে, রফতানিতেও তেমন করে। তাহলে বলেন, ব্যাংকের দরকার আছে, নাকি নেই?




- আছে, স্যার। কিন্তু আমরা তো সুদের লেখক। কুরআনে স্পষ্ট লেখা আছে, সুদের লেখক জাহান্নামে যাবে।




- আচ্ছা, এইবার আসেন, সুদের ব্যাপারটায়। এই যে ৩০০ কোটি টাকার চিনি আমদানি হলো, ইম্পোর্টার তো ৩০০ কোটি টাকা ইম্পোর্ট করার সময় পুরোটা ব্যাংককে দেয়নি। চিনি বেচে তারপর সেই টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছে।




- তা দিয়েছে।




- চিনি বেচে ইম্পোর্টার লাভ করেনি?




- করেছে।




- সেই লাভে ব্যাংকের অংশীদারত্ব আছে?




- আছে।




- ইম্পোর্টার যদি সেই লাভের একটা অংশ ব্যাংককে দেয়, তাহলে সেটা হারাম হবে?




- না, স্যার।




- আচ্ছা, এইবার বলেন, ব্যাংক এই ৩০০ কোটি টাকা কোথায় পেয়েছে?




- ডিপোজিট থেকে।




- ডিপোজিটর এর টাকা খাটিয়ে ব্যাংক ইম্পোর্টার এর লাভের অংশ পেলো। এই টাকায় ডিপোজিটর এর দাবী আছে?




- থাকা উচিৎ।




- ব্যাংক যদি ডিপোজিটরকে এই লাভের ভাগ দেয়, সেটা হারাম হয়ে যাবে?




- না, স্যার।




- এতোক্ষণ পর্যন্ত আমি যা বললাম, আপনার এতে কোনো কনফিউশান আছে?




- না, স্যার।




- আচ্ছা, এইবার বলেন, ব্যাংকের কাজ কী?




- ব্যাংকের কাজ টাকা জমা নেওয়া, লোন দেওয়া এগুলো।




- এগুলোকে এক কথায় কী বলে, জানেন?




- কী, স্যার?




- আর্থিক মধ্যস্থতা। ব্যাংক সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে আর্থিক মধ্যস্থতা করে। ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় Financial intermediation. ব্যাংক হলো Financial Intermediary




- আরেকটু বুঝিয়ে বলবেন, স্যার।




- ধরেন, আপনার কাছে ১০,০০০ টাকা আইডল আছে। আমার কাছে এক লাখ টাকা আইডল আছে। আমাদের প্রায় সবার কাছেই কিছু টাকা থাকে, যেগুলো আমাদের এই মুহূর্তে কাজে লাগছে না। সমাজের এরকম একটা গ্রুপ আছে, যাদের হাতে উদ্বৃত্ত টাকা আছে, যেটা তাদের এই মুহূর্তে কাজে লাগছে না। আছে না?




- তা আছে, স্যার।




- আবার, এরকম একটা গ্রুপ আছে, যাদের কাছে টাকা নেই, কিন্তু তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। সেই ব্যবসায় তাদের পুঁজি দরকার। যেমন ধরেন, আমাদের চিনির ইম্পোর্টার। তার একবারে ৩০০ কোটি টাকা দরকার। এরকম আরও অনেক ব্যবসা কিংবা ব্যবসার আইডিয়া আছে অনেক মানুষের। আছে না?




- আছে।




- যাদের কাছে অলস টাকা আছে, তারা হলো সারপ্লাস ইউনিট। আর যাদের টাকা নেই, আইডিয়া কিংবা ব্যবসা আছে, তারা হলো ডেফিসিট ইউনিট। ব্যাংক এই দুই ইউনিটের মধ্যে ম্যাচমেকিং করে। তাহলে, বলেন, ব্যাংকের কাজ গুরুত্বপূর্ণ কি না?




- অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যাংক তো সুদ খায়, সুদ দেয়।




- এইবার আসেন, আপনার হাতে অলস টাকা আছে। আপনি সেটা কেনো ব্যাংকে রাখবেন? আপনার ইন্সপিরেশন কী? ব্যাংকে টাকা রাখতে তো আপনার রিকশাভাড়া দিয়ে ব্যাংকের শাখায় যেতে হবে। উঠাতে আবার রিকশাভাড়া দেওয়া লাগবে।




- তা লাগবে।




- তাহলে, আপনার লস হয়ে যাবে না?




- তা যাবে।




- এরপরে আসেন, ২০১০ সালে এক কেজি চালের দাম ছিলো ১০ টাকা। এখন, সেটা ৮০ টাকা। ২০১০ সালে আপনি ১ কেজি চাল না কিনে ব্যাংকে ১০ টাকা রেখেছিলেন৷ ২০২৬ সালে সেই ১০ টাকা উইথড্র করে দোকানে গেলেন চাল কিনতে। দোকানদার আপনাকে ১ কেজি চাল দেবে?




- না, দেবে না।




- আবার দেখেন, ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করছে। ব্যবসায় লাভ হচ্ছে। সেই লাভের ভাগ ব্যাংকের পাওয়া উচিৎ নয়? সেই টাকা তো ডিপোজিটর এর। ডিপোজিটর কী সেই টাকার আয়ের ভাগ পাবে না?




- পাওয়া উচিৎ।




- আপনি, আমি ব্যাংকে শ্রম দিচ্ছি। আমাদের কিছু হাদিয়া পাওয়া উচিৎ না? বেতন না পেলে আপনি ব্যাংকে আসবেন?




- বেতন না পেলে আসবো কেনো, স্যার?




- ব্যাংক সেই বেতন আপনাকে কোথা থেকে দিবে?




- চিন্তার বিষয়?




- তাহলে ব্যাংক ডিপোজিটর এর টাকার রিটার্ন দেবে, কর্মচারীর বেতন দেবে, ভবনের ভাড়া দেবে, কাগজ-কলম কিনবে, কম্পিউটার কিনবে, অন্যান্য খরচ করবে- এগুলোর ব্যাপারে আপনার আপত্তি আছে?




- না, স্যার।




- এই সব খরচের টাকা লোনের কাস্টমারের কাছ থেকে আদায় করবে, অন্যান্য আয় করবে- এ ব্যাপারে আপনার আপত্তি আছে?




- না, স্যার।




- তাহলে, আপত্তি কোথায়?




- সুদ, রিবা। আল্লাহতাআলা কুরআনে স্পষ্ট বলেছেন, আহাল্লাহুল বাইয়া, হাররামুল রিবা। ব্যবসা হালাল, সুদ হারাম।




- ব্যাংকের সুদ যে রিবা, সেটা আপনাকে কে বললো?




- এটার নামই তো সুদ।




- এটার নাম সুদ, কিন্তু এটার পারপাস তো জুলুম নয়। রিবা হলো সেটা, যা জুলুম করে নেয়া হয়। ব্যাংকের সুদ তো জুলুম নয়, এটা একটা সিস্টেমের উপাদান। এটাকে আপনি রিটার্ন বলতে পারেন।




- কিন্তু, সব হুজুর তো এটাকে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন?




- আচ্ছা, তাহলে বলেন, ইসলামি ব্যাংকের মুনাফা হালাল?




- সেটা তো হালাল ই।




- আপনি তাহলে আমাদের সুদ কে রিনেম করে মুনাফা বানাইয়া দেন।




- দুইটা তো দুই জিনিস, স্যার। আর ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রসিডিওর ও তো আলাদা। 




- রেজাল্ট কি এক নয়?




- কীরকম এক, স্যার?




- ওরাও ব্যবসায় হেল্প করছে, আমরাও ব্যবসায় মধ্যস্থতা করছি। ওরাও রিটার্ন নিচ্ছে, দিচ্ছে। আমরাও রিটার্ন দিচ্ছি, নিচ্ছি। শুধু প্রসিডিওর এর কারণে ওদেরটা হালাল, আর আমাদেরটা হারাম?




- আমি কিছুটা বিভ্রান্ত, স্যার। মনে হচ্ছে, আপনার কথায় যুক্তি আছে।




- আচ্ছা, দেশে যদি ব্যাংক না থাকতো, ব্যবসা-বাণিজ্য স্মুথলি চলতো? কলকারখানায় উৎপাদন স্মুথ থাকতো? অর্থনীতির গতি থাকতো?




- কিছু ঝামেলা তো হতোই!




- তাহলে, স্বীকার করেন, ব্যাংক অর্থনীতির অন্যতম চালক?




- তা তো স্বীকার করি ই।




- চিনির আমদানিকারক যদি ব্যাংকের সহায়তায় স্মুথলি চিনি আমদানি করতে না পারতো, তাহলে তো আপনাকে ১০০ টাকার জায়গায় ১২০ টাকা দিয়ে চিনি কিনে খেতে হতো।




- কেনো?




- এই ৩০০ কোটি টাকা যদি আমদানিকারক নিজে জোগাড় করতে যেতো, তার কতো খরচ হতো, ভেবেছেন?




- বুঝছি, স্যার।




- তাহলে, ব্যাংকে চাকরি করে কি আপনি দেশের অগ্রযাত্রায় কোনো অবদান রাখছেন?




- মনে হচ্ছে, স্যার।




- রিজিক হালাল মনে হচ্ছে?




- কিছুটা মনে হচ্ছে, স্যার।




- আমরা এটা নিয়ে আরও আলোচনা করতে পারি। আজকে এই পর্যন্ত থাক।




- ঠিক আছে, স্যার। থ্যাঙ্কিউ, স্যার।




- আজ থেকে হীনমন্যতা কমবে?




- কিছুটা কমবে, স্যার।




- ভালো থাকেন।




- আপনিও ভালো থাকেন, স্যার।




ব্যাংকে চাকরি করি বলে জীবিকা হালাল নয়- এ চিন্তা আমাকে কখনও পীড়িত করে না। কারণ, আমি জানি, আমার শ্রম বেচে ব্যাংক থেকে বেতন পাই, যেটা সম্পূর্ণ হালাল। তবে, আমি যদি কাজে ফাঁকি দিই, যদি আমার নিবেদন না থাকে, যদি আমি ব্যাংকের আয়ে কন্ট্রিবিউট না করি- সেই আয় আর হালাল থাকবে না।




রিবা বা জুলুম কোনটা- সে নিয়ে লিখবো একদিন।




ভিন্নমত থাকতে পারে, সেটা প্রকাশ করবার অধিকারকে আমি সম্মান করি৷ একই সাথে আশা করি, আমার মত প্রকাশের অধিকারকেও অন্যরা সম্মান করবেন।

<>[][]

🎁 Your Special Offer is Loading...

Please wait a moment. You'll be redirected automatically after the countdown.

10s

⏳ Stay here — your offer will open in a new page.
✅ Redirect happens only once per session.

Comments